
চট্টগ্রামে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একটি মামলায় ৯ জনের বিরুদ্ধে ৫৪৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অন্যটিতে ৯টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে এক হাজার ৭৭ কোটি ১১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) সকালে দুদক প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান ও উপপরিচালক মুনাবীল হক বাদী হয়ে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ পৃথক মামলা দুটি করেন।
৫৪৮ কোটি টাকা পাচারের মামলা
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৫৪৮ কোটি টাকা মেহের স্পিনিং, টপ টেন ট্রেডিং, গোল্ড স্টার ট্রেডিং ও আলম ট্রেডিংয়ের বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব নম্বরে স্থানান্তর করেন। এরপর সেই টাকা নেওয়া হয় এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, সোনালী ট্রেডার্স, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ও এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় চলতি হিসাবে। এরপর সেই টাকা পাচার করা হয়েছে বলে দুদকের তদন্তে তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে দুর্নীতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৪০৯, ১০৯, ৪২০ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ৪(২), ৪(৩) ধারা অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে।
মামলায় অপর আসামিরা হলেন— ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মিফতাহ উদ্দীন, ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল মাওলা, সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকিজ উদ্দীন, শব মেহের স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান, পরিচালক মোহাম্মদ শওকত উসমান, টপ টেন ট্রেডিং হাউসের প্রোপাইটর মো. আলমাছ আলী, গোল্ড স্টার ট্রেডিং হাউসের প্রোপাইটর বেদারুল ইসলাম ও আলম ট্রেডিং অ্যঅন্ড বিজনেস হাউসের প্রোপাইটর নুরুল আলম।
এক হাজার ৭৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলা
অপর মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং মেসার্স আদিল করপোশন নামের নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর সঙ্গে যোগসাজশ করে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তিনি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করান। এছাড়া, সিআইবি রিপোর্ট গ্রহণ, প্যানেল আইনজীবীর আইনি মতামত এবং প্রস্তাবিত জামানত সম্পত্তির মূল্যায়ন, গ্রাহকের সক্ষমতা ও ঋণের যোগ্যতা সঠিকভাবে যাচাই না করেই ২০১৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাস করান।
এই অনুমোদিত বিনিয়োগ বা ঋণ সীমা ২০১৭ সালে ৪০০ কোটি টাকা থাকলেও বিভিন্ন সময়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ঋণসীমা বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৮১ কোটি ৪৫ লাখ টাকায়।
২০২২ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ২৯টি ডিলের মাধ্যমে ক্রাফট বিজনেস অ্যান্ড ট্রেডিং হাউস, ইউনিক ট্রেডার্স অ্যান্ড বিজনেস হাউসসহ মোট ৯টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের কাছে এক হাজার ৭৭ কোটি ১১ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে তা এস আলমের বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান—এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিল, চেমন ইস্পাত, গ্লোবাল ট্রেডিংসহ এস আলমের ভাইয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে স্থানান্তর করা হয়।
মামলায় সাইফুল আলম মাসুদ ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন— মোস্তান বিল্লাহ আদিল, আব্দুস সামাদ, ওসমান গণি, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হাসান, রাশেদুল আলম, আশরাফুল আলম, ফারজানা পারভীন, আহসানুল আলম, মায়মুনা খানম, শারমিন ফাতেমা, মিফতাহ উদ্দিন, মোহাম্মদ সাব্বির, মাহবুব উল আলম, মনিরুল মওলা, কায়সার আলী, এহসানুল ইসলাম, সিরাজুল কবির, তাহের আহমেদ চৌধুরী, মো. সাইফুদ্দীন, গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী, এমদাদুল ইসলাম, আবুল কালাম, তারিকুল ইসলাম চৌধুরী, এস এম নেছার উল্লাহ, ছাদেকুর রহমান, তারেকুল ইসলাম চৌধুরী, আনছারুল আলম চৌধুরী, এম এ মোনায়েম, মো. মনজুর হাসান এবং ওয়াহিদুর রহমান।
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন এবং ঋণসীমা বৃদ্ধি করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর ভিত্তিতে মামলাটি দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯/৪২০/১০৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা অনুযায়ী দায়ের করা হয়েছে।
মামলা দুটির তথ্য সিভয়েস২৪’কে নিশ্চিত করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপপরিচালক সুবেল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘তদন্তকালে অপরাধের সাথে সংগতিপূর্ণ অন্য কোনো তথ্য কিংবা অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তা আমলে নেওয়া হবে।’
পাঠকের মতামত